ঐতিহাসিক অডিও পাঠকক্ষঅডিও কক্ষ

১৯৭৪ ঐতিহাসিক কণ্ঠস্বর · Archival Voice Heritage
রবীন্দ্রসংগীত সম্বন্ধে সমস্যা ও মতামত (১৯৭৪)
বক্তা: দেবব্রত বিশ্বাস · রেকর্ডিং: ৫ই মার্চ ১৯৭৪
শুনতে প্লে চাপুন
দৈর্ঘ্য: ২৯ মিনিট ২৫ সেকেন্ড (262 টি সিঙ্কড বাক্য)
সক্রিয় ক্যাপশন · Live Caption
প্লে বোতাম চেপে ১৯৭৪ সালের অডিও এবং রিয়েল-টাইম বাংলা ক্যাপশন শুরু করুন...
262 টি বাক্য
রবীন্দ্রসংগীত সম্বন্ধে আমার সমস্যা এবং আমার মতামত এবং রবীন্দ্রনাথের মতামত আমি রেকর্ড করে দিয়েছিলাম।
তা আপনি সেটা শুনে খুব মোহিত হয়েছিলেন।
আপনার জন্য আবার সেটা টেপ করে দেওয়া হচ্ছে।
আপনি দয়া করে আমার মৃত্যুর পর সকলকে সেটা শোনাবেন।
তোমারে গত ১৯৭৩ সনের ডিসেম্বর মাসের ১৮ই তারিখ বোধহয় না?
আর জানুয়ারি মাস মানে ১৯৭৪ সনের জানুয়ারি ১লা জানুয়ারি কিছু গান আমি রেকর্ড করে দিছিলাম।
তারপরে তো আর গান গাইতে পারি নাই।
শরীরটাও ভালো ছিল না তারপরে তোমার মেশিনও পাওয়া যায় নাই।
এইবার আবার আজ হইলো তোমার মার্চ মাসের ৫ তারিখ ১৯৭৪ সন।
আজ আবার সন্ধ্যাবেলা বইছি।
তাস খেলা হইলো না এহন কী করি।
তা এহন আমি গান গাওয়ার আগে তোমারে একটা লেকচার দিমু কইছিলাম সেই লেকচারটা দিয়া ফেলাই।
চান্স পাইছি যখন ছাড়ি না।
এহন সেই আমার রবীন্দ্রসংগীতের যে একটা বোর্ড আছে তার গপ্পো তোমারে আমি কইছিলাম।
তারপরে আমার সেই গুরুবন্দনা গানটার কথা তোমারে আগে দেওয়া হইছে।
সেইসব কথাই কইতেছি।
এহন এইসব এই বোর্ড আমার গান টান কিছুতেই তারা পাস করে না।
মানে অনুমোদন করে না আর কি আটকায়া দেয় এই কারণে সেই কারণে।
আমি তো গান গাওয়া বন্ধ করে দিছিলাম।
তারপরে আবার ১৯৭০ সনে আমার কোম্পানির মালিক আসলেন আমার ঘরে আইসা আবার বললেন কিছু গান করেন আমি করলাম।
তার মধ্যে কয়েকটা approve হইছে আমি জানি না।
তো যাই হোক সেই সময় একটা সার্কুলার আমারে দেখাইছিলেন সেই সার্কুলারটা আমি নকল করে থুইছিলাম।
সেই সার্কুলারে দেখলাম নতুন নতুন সব নিয়ম বাইর করছে ওরা।
কী করে রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করতে হবে তো সেই সার্কুলারটা আমি একটু পইড়া শুনাই কেমন?
সেই সার্কুলার হইলো ২২/১১/৭২ তারিখেরই আমাদের কোম্পানিরে লিখছে।
It has been noticed for some time past that there is a growing tendency amongst the artists to make use of interlude music at the time of recording Rabindra Sangeet by taking help of various types of musical instruments and also foreign tunes during the recital of songs which sound discordant to the ear and also militates against the true spirit of the songs. By doing so, sometime it so happens that the interlude music gains precedence over the original tunes of Rabindra Sangeet, thereby subduing the real flavor of the rendering of the songs. Therefore, in paragraph 3, it has already been impressed upon you the importance of making use of subdued music in order to maintain the style and mode of Rabindra Sangeet. But in the absence of any method for eliminating the influence of Western style of music in the recorded songs by determining the basic requirements of musical accompaniments, no suitable arrangements could be made so far in the matter. As already communicated to you that the basic requirements as indicated in the attached sheet are to be strictly adhered to at the time of recording of Rabindra Sangeet in future. তারপর একটা শিট সেই attached শিটে বাংলা কথায় লেখা আছে রবীন্দ্রসংগীতের উপযোগী যন্ত্র।
ক।
ক মানে এক নম্বর আর কি।
এসরাজ, বাঁশি, সেতার বা সারেঙ্গি, তানপুরা, বেহালা, দোতারা, একতারা, বাস বেহালা বা অর্গান।
খ।
পাখোয়াজ, বাঁয়া তবলা, খোল, ঢোল ও মন্দিরা।
ব্যস।
প্রতি গানের মূল আবৃত্তির প্রতি লক্ষ্য রেখে অনুকূল আবহ সংগীত যন্ত্রের রচনা করে আরম্ভে এবং যেখানে গায়কের কণ্ঠে বিশ্রাম প্রয়োজন সেখানে তা প্রয়োগ করতে হবে।
যে কয়টি যন্ত্রের উল্লেখ করা হয়েছে গানের সঙ্গে তার সব কটিকেই বাজানো যেতে পারে কিন্তু কোন যন্ত্রটি কিভাবে আবহ সংগীতে বাজবে সংগীত রচয়িতাকে তা স্থির করতে হবে।
গানের প্রতিটি ছত্রের ভাবটির প্রতি লক্ষ্য রেখে আবহ সংগীতে গায়কের গলার শব্দকে ছাড়িয়ে যাবে না কখনো।
কণ্ঠের বিশ্রামের সময় বা গান আরম্ভের পূর্বে যখন যন্ত্রে আবহ সংগীত বাজবে তখনও এই দিকটির প্রতি বাজিয়েদের যেন বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখেন।
তাল যন্ত্রের সঙ্গতের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে তাদের ছন্দ বা বোল যেন কথার ছন্দ বা লয়ের বিপরীত না হয়।
অর্থাৎ দ্রুত ছন্দের গানে যেমন দ্রুত লয়ের ঠেকার প্রয়োজন ধীমা লয়ের গানে তেমনি ধীমা লয়ের ঠেকার প্রয়োজনকে মানতেই হবে।
কথার উপর ঝোঁক দিয়ে অনেক গান গাইতে হয় এইসব গানের সঙ্গে সঙ্গতের সময় তাল বাদ্যেও কথার ছন্দের অনুকূল ঝোঁক প্রকাশ পাওয়া দরকার যাতে গানের ভাবের সঙ্গে I mean গানের ভাবের সঙ্গে কথার ভাবের সঙ্গতি থাকে।
বুঝলা এই তারা সার্কুলার দিছে।
তা আমি এই বোর্ডের যে অনারারি সেক্রেটারি তারে আমি চিনতাম অনেকদিন আগে থেকেই।
তিনি বুড়া ভদ্রলোক।
লোক খুব ভালো।
সাথেও নাই পাঁচেও নাই।
তবে নাম কাওয়াস্তে থাকত আর কি।
তিনি আছেন যারে আমি একটা চিঠি লিখছিলাম।
চিঠি লেখনের তিনি অবশ্য পরে জবাব দিছেন আমারে।
তো চিঠিটার মস্ত বড় চিঠি তো।
তা অল্প কইরা কইরা কইয়া দিই সংক্ষেপে।
আমি প্রথমে লিখছি যে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপারে সুস্পষ্ট মতামত দেওয়ার আর কেউ নাই সকলেই মারা গেছেন।
আর এই বোর্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের মধ্যে আপনিই সবচেয়ে প্রবীণ।
সুতরাং আপনারে ছাড়া আর কারে কমু।
তা আসল কথা হইলো ব্রাহ্ম পরিবারে আমার জন্ম হইছিল তাই বাল্যকাল থেকেই রবীন্দ্রসংগীত চর্চার মধ্যে রবীন্দ্রসংগীতের রসে মনটা আমার রসায়িত হইছিল।
তারপরে ১৯২৭ সন থেইকা আমি কলকাতার বাসিন্দা হয়া গেলাম।
সেই সময় থেইকা এই ব্রাহ্ম সমাজের পাল্লায় পইড়া বহু ব্রহ্ম সংগীত আর মেলা রবীন্দ্রসংগীত আমার শিখতে এবং গাইতে হইছে।
আর যাদের কাছে শিখতাম তারা আজ কেউ আর বাইচা নাই।
জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আমার যাতায়াত আছিল।
হিন্দুস্তান ইনস্যুরেন্সে চাকরি করার সময় সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর মশায়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়।
এবং আলাপ হওনের সৌভাগ্য হইছিল এবং বেশ ভালো করিই হইছিল।
এবং সেই সূত্রে পনেরো বিশ বাড়িতে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর স্নেহ পেয়ে আমি ধন্য হইছি।
তাঁর কাছে আমি বহু গান শিখছি তিনি নানা রকম experiment করছেন পিয়ানো বা ওর্গান দিয়া experiment করতেন।
ছাপানো স্বরলিপি থেকে একটু অদল বদল করি আমাগো শিখাইয়া জিজ্ঞাসা করতেন যে কেমন লাগে।
আমাগো যদি বলতাম ভালো লাগবো বা ভালো লাগলো না অমনি কইয়া দিতাম।
তারপরে হারমোনি কইরা তিনি আমাগো গান শিখাইছেন রবীন্দ্রসংগীত এবং নানা অনুষ্ঠান ও গান গাওয়া হইছে।
তারপরে রথিবাবু রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর চারুবাবু তারা যারা নাকি মিউজিক বোর্ডে ছিলেন তারা আমার গান ভীষণ পছন্দ করতেন আপনি তো দেখছেন হেইটাই।
আর বড়ো ওনাদের দৌলতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথরে গান শুনাইয়া আমি খুশী করার সৌভাগ্য আমার হইছিল।
এত কথা বলবার উদ্দেশ্য হইলো বাল্যকাল থেকে শুরু করিয়া নানা ধরনের রবীন্দ্রসংগীত নানা ভাবে গাইতে গাইতে আমার জীবনের ৬৩ বছর গেছে কাইট্টা।
কাজে কাজেই যতই বিনয় করি না কেন এইটুক আমি আমার কইতেই হয় যে সুষ্ঠুভাবে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করার ব্যাপারে আমার কিছুটা অভিজ্ঞতা হইছে।
আর আমার রেকর্ডগুলি তো যেমনভাবে সমাদৃত হইছে তুমি তো জানোই।
তবে এইটুক বিশ্বাস আমার আছে যে নিছক সস্তার রুচি পরিবেশন করিয়া এইটা সম্ভব হয় নাই।
ব্রাহ্ম সমাজের যারা বুড়া তারা এবং যারা জোয়ান বা বাচ্চা তারা তো আমারে চিরকালই ভালোবাসছে বরাবরই।
আর এই ব্রাহ্ম সমাজের বাইরেও প্রচুর রবীন্দ্রসংগীত অনুরাগী রইছে তারা ও আমার গান শুইনা খুশি হইছে।
তারপরে অবশ্য তারে কইছি যে কয়েক বছর আগে একটা ঘটনা ঘটছিল।
একটা উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসরে একজন বিদেশী composer নিমন্ত্রণ করা হইছিল এই আসরে আমিও আছিলাম।
এখন বিদেশী composer তার একটা যন্ত্র সংগীতের অর্কেস্ট্রা টেপ কইরা শুনাইবেন।
বাজনা শেষ হয়ে গেলেই একবারে নানা ধরনের প্রশংসা superb, wonderful, excellent এইসব কথা।
সকলেই কইল একজন নামকরা বাঙালি যন্ত্রশিল্পী সে কিছু কয় না।
তারপর তার বন্ধুবান্ধবরা আপনে কিছু বলেন।
তখন বাজনার শুইনা তার মনে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হইছিল সেইটি কওনের শুরু করলেন।
তাঁর কথাগুলো ঠিক আমার মনে নাই কি কইছিলেন তবে এইটুক ভাবার্থ সংক্ষেপে বইলা বাজনা শুইনা এমন হইলো তারা যেন এক উটের পিঠে মরুভূমির ওপর দিয়া যাইতেছেন।
হঠাৎ দারুণ ঝড় উঠল ঝড়ে একবারে ধুলা ঠুলা উড়াইয়া বালু উড়াইয়া চোখ বন্ধ কইরা ফালান তারপরে আস্তে আস্তে ঝড় থাইমা গেল তারপরে আবার চলতে লাগল সেই একবারে জোছনা তারা ফুটছে ফটফট কইরা এখন ভদ্রলোকের কথা শেষ না হইতে সেই যে বিদেশী composer একদম ফাল দিয়া উইঠা কইলো যে আপনি ঠিক কইছেন ইউ আর রাইট।
আমার এই compositionটার নাম Caravan।
আমি শুইনা অবাক।
এহন সেই বাঙালি যন্ত্রশিল্পী ছিলেন শ্রী রাধিকা মোহন মৈত্র।
তিনি নিজে যন্ত্রী।
তার বাদ্য যন্ত্রের ভাষা তাঁর হৃদয়ে একটা আবেগ তুলছিল সেই আবেগের মধ্যে মাধ্যমে তিনি একটা কিছু আইডিয়া কইরা রইছিলেন যার জন্য তিনি এইরকম কইতে পারছেন।
এহন রাধিবাবুর হয়তো এই দেড়া দুওরি ঘটনাটা হয়তো মনে নাই।
কিন্তু আমার এই ঘটনাটা চিরকাল মনে থাকবে।
তারপরে আমার মনে হইছিল যে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের বিভিন্ন আওয়াজ এবং বিভিন্ন সুর আমার মনেও তো বিভিন্ন আবেগ সৃষ্টি করে।
যেমন সানাই বাঁশি বা অন্য কোনো তার যন্ত্র।
কিভাবে কেন এই আবেগ সৃষ্টি তা তো বুঝানো আমার পক্ষে সম্ভব না।
এরপর থেইকা আমি অনেক ভাবছি।
রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা কথা আমারে প্রেরণা যোগাইলো।
তিনি বলছিলেন ইউরোপীয় সংগীতে যে হারমোনি অর্থাৎ স্বরসঙ্গতি আছে আমাদের সংগীতে তা চলিবে কি না।
প্রথম ধাক্কাতেই মনে হয় না ওটা আমাদের গানে চলিবে না ওটি ইউরোপীয়।
কিন্তু হারমোনি ইউরোপীয় সংগীতে ব্যবহার হয় বলিয়াই যদি তাকে একান্তভাবে ইউরোপীয় বলিতে হয় তবে একথাই বলিতে হয় যে যে দেহত্ব অনুসারে ইউরোপীয় অস্ত্রচিকিৎসা চলে সেটা ইউরোপীয়।
অতএব বাঙালি দেহে ওটা হাড়িপাকের ভুল হইবে।
বুঝলা এইসব রবিঠাকুর কইয়া গেছে।
তারপর আরো তিনি কইছেন যে ইহার অভাবে আমাদের সংগীতে যে অসম্পূর্ণতা সেটা যদি অস্বীকার করি তবে তাহাকে কেবলমাত্র তাহাতে কেবলমাত্র কণ্ঠের জোর বা দম্ভের জোর প্রকাশ পাইবে।
তবে কিনা ইহাও নিশ্চিত যে আমাদের গানে হারমোনি ব্যবহার করিতে হইলে তার ছাঁদ স্বতন্ত্র হইবে।
আরো বলছেন তিনি যাই হোক আমাদের সংগীতের পক্ষে এই একটা বড় মহল ফাঁকা আছে এটা যদি দখল করিতে পারি তবে এইদিকে অনেক পরীক্ষা ও উদ্ভাবনার জায়গা পাইব।
যৌবনের স্বভাবসিদ্ধ সাহস যাদের আছে এবং লক্ষ্মীছাড়ার ক্ষ্যাপা হওয়া যাদের গায়ে লাগিল এই একটি আবিষ্কারের ক্ষেত্র তাদের সামনে পড়িয়া।
আজ হোক কাল হোক এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই লোক নামিবে।
বুঝলা।
এহন কথা হইলো যে আমি নামিয়া পড়লাম।
নামিয়া পড়লাম ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে আমি দেখছি নানা ভাবে experiment করতে তারপরে রাধুবাবুর ওই কথাগুলি আমার একটা ভাবনার জোগান দিয়া গেল।
আর পাশ্চাত্য সংগীত সম্বন্ধে আমার কোনো জ্ঞানই নাই কিন্তু আমি ভাইবা দেখছি এই গলার এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের বিভিন্ন আওয়াজ এবং সুর মাইনষের হৃদয়ে যে আবেগ সৃষ্টি করে তা কোনো দেশকালের নিয়ম মানে না।
রবীন্দ্রসংগীতের একটা আবেগ সৃষ্টিকারী ক্ষমতা আছে এহন হেইডারে আরো ভালো করে ধার দিয়া বুঝলা কিনা আমার রেকর্ড করার সময় দেশী বিদেশী নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রগুলি লইয়া আমি নানাভাবে experiment করছি।
এহন ওই বাদ্যযন্ত্রগুলি দিয়া আমার মনে যে এফেক্ট হয় সেইডানই শ্রোতাদের মনে তুলবার জন্য আমি চেষ্টা করছি।
তবে এইটা ঠিক যে গান গাওয়ার সময় আমি expression-এর স্বাধীনতা নিছি।
কারণ রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই ব্যাপারে পথ দেখাইছে।
বাদ্যযন্ত্রের সুর সাজাইয়া গানের রূপ ফুটিয়ে তোলবার ব্যাপারে আমি কতখানি সফল সেটা বিচার করবে তোমরা যারা শ্রোতা।
বুঝছ না তোমাদের ভারডিক্ট আমি মাথা পেতে নিব ইয়ে তো।
আমি অনেক সময় দেখছি আমি ঠিক সফল হই নাই।
তাতে আমার কষ্ট হইছে।
তবে experiment সব experimentে যে সফল হইব এমন কোনো কথা আছে।
এইটা ঠিক যে আমার অভিজ্ঞতা দুবারই হইছে।
তবে প্রশ্ন করা যাইতে পারে রবীন্দ্রনাথের গান তো নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ ওইসব বিদেশী যন্ত্রের সাহায্য নেওনের কী প্রয়োজন।
তাইলে আবার প্রশ্ন ওঠে মিউজিক বোর্ডের রবীন্দ্রসংগীতের উপযোগী বাদ্যযন্ত্রের যে তালিকা দিছে ওই তালিকাতে যে বাদ্যযন্ত্রের নামগুলি লেখা আছে সেই যন্ত্রগুলিরই বা কী প্রয়োজন প্রয়োজন।
যাই হোক রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নকে একটা বাস্তব রূপ দেওনের লাইগা আমি লাইগা গেলাম।
কিন্তু বাধা পাইলাম ১৯৭৩ সনে।
আমার দুইটা গান ওরা আটকাইয়া দিল।
পুষ্প দিয়া মারো যারে Excessive music accompaniment hampers the sentiment of the song. আরেকটা গান তোমার শেষের গানের।
The tempo of the song is too quick music accompaniment is too much and the song itself is not sung according to notation. তা নোটেশন আইজ কোন জায়গায় ভুল হইছে তারা লেখে নাই।
বুঝলা।
এইডা তরে আমি কইছি বড় আমার অনারারি সেক্রেটারি।
তারপর হিন্দুস্তান রেকর্ড কোম্পানি আমারে তার মতামতের জন্য অনেকদিন আমারে কইছে শেষ পর্যন্ত কোম্পানিরে আমি বলছি যে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার এবং রেকর্ড করার ব্যাপারে আমার কর্তব্য জ্ঞান দায়িত্ব জ্ঞান অন্য কারো থেকে কম এইটা আমি বিশ্বাস করি না।
আর এই যে মিউজিক বোর্ডের পরীক্ষকের মতামত এইটা subjective সুতরাং আমার কিছু কওনের নাই।
আমি গান রেকর্ড করা বন্ধ করে দিলাম।
তারপরে ১৯৭০ সনে আবার সেই রেকর্ড কোম্পানির মালিক আইসা হাজির।
আমি আরও কয়েকটা গান করছিলাম।
তারপরে আমি যাই।
তারপরে রেকর্ড কোম্পানি আমারে সেই সার্কুলারটা যখন দেখাইলেন আমি তো দেইখা তাজ্জব বনিয়া গেছি।
কার বা তাদের মাথায় এই নিয়ম বাইর হইলো আমি তো জানি না।
কিন্তু আমি সেই সেই অনারারি সেক্রেটারিরে জানাইলাম যে ব্যক্তি বিশেষের ভাবনা দিয়া ভাবিত হইয়া রবীন্দ্রসংগীতের জাত বাঁচানো যাবে এমন কথা রবীন্দ্রনাথ নিজেও ভাবতেন না।
কারণ আমি জানি তিনি দিলীপ বাবুরে কইছিলেন।
দিলীপ বাবুরে তিনি কইছিলেন গানের গতি অনেকখানি তরল কাজেই তাহাকে গায়ককে খানিকটা স্বাধীনতা তো দিতেই হবে না দিয়া গতি কি ঠেকাব কি করে।
তাই আদর্শের দিক দিয়া আমি বলিনি যে আমি যা ভাব এবং সুর দিয়েছি তোমাকে গাওয়ার সময় সেইভাবেই ভাবিত হতে হবে।
কাজে হতেই পারে না।
শুনলা এইডা রবিঠাকুর নিজেই কইয়া গেছেন।
সুতরাং কার কথা মানুম আমি রবীন্দ্র নাথের কথা না যারা নতুন নিয়ম করছে তাগো।
তারপরে আমি সেই সার্কুলারের কিছুটা পোরশন আমি লিখে দিছি।
তারপরে আমি কইছি যে এই Discordant to the ear এই কথাটার কোনো মানে নাই কারণ কানে কানে ভেদাভেদ থাকবেই সব গান একরকম হয় না আর কোনটা true speed of the song সেটা ব্যক্তি বিশেষে আলাদা হয়।
আর style and mode of Rabindra Sangeet কথাগুলি নিতান্তই অর্থহীন কারণ শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসংগীতের ওস্তাদগো মধ্যেই এই ব্যাপারে যথেষ্ট মতভেদ আছিল এবং এখনও আছে।
কলকাতায় যতগুলি রবীন্দ্রসংগীতের প্রতিষ্ঠান আছে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে ওস্তাদেরা বলেন বিশুদ্ধ রবীন্দ্রসংগীত কারে কয় তারা হেইডাই বুঝেন।
আর দেখা যায় প্রত্যেকেই গাওয়ার সময় নিজেদের মত কইরা গায়।
আলাদা আলাদা।
সুতরাং আসল নকল বোঝা মুশকিল।
রবীন্দ্রনাথ তো নিজেই এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট মাস্টারি ব্যবস্থা করিয়া যান নাই।
কিন্তু এই যে ইংরেজি ভাষায় লিখিত নির্দেশের শেষের অংশটুকু পড়লে মনে হয় মিউজিক বোর্ডের যত ক্রোধ আর যত রাগ সব যেন বাদ্যযন্ত্রের ওপর।
বোর্ড বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের ওপর বিজয় নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়া রবীন্দ্রসংগীতকে পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব থেইকা রক্ষা করতে চাইছে এবং সেই উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষায় কী কী বাদ্যযন্ত্র রবীন্দ্রসংগীতে উপযোগী এবং সেই যন্ত্রগুলি কিভাবে বাজানো লাগব সব নির্দেশ দিছেন।
এখন পাশ্চাত্য সংগীতের স্বরসঙ্গতি সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ কী কইছেন জানোই।
আর তা ছাড়া আরো সুস্পষ্ট মতামত তিনি নানা রকম ভাবে ব্যক্ত করছেন নানা লেখা।
সেই কয়েকটা আমি আবার তুইলা দিলাম।
১ নম্বর আমাদের দেশের অনেক জিনিসকেই ইউরোপের হাত হইতে পাওয়ার জন্য আমরা হাত পাতিয়া বসিয়া আছি।
আমাদের সংগীতকেও একবার সমুদ্র পার করিয়া তাহার পরে যখন তাহাকে ফিরিয়া পাইব তখনই হয়তো ভালো করিয়া পাইব।
আমরা বহুকাল ঘরের কোণে কাটাইয়া আসছি এই জন্য কোনো জিনিসের বাজার দর জানি না।
নিজের জিনিসকে যাচাই করিয়া লইব কোনখানে আমাদের গৌরব তাহা নিশ্চিত করিয়া বুঝিব সে শক্তি আমাদের নাই।
আমাদের শিল্পকলায় সম্প্রতি যে উদ্বোধন দেখা যাইতেছে তাহার মূলেও ইউরোপের প্রাণশক্তির আঘাত রহিয়াছে।
আমার বিশ্বাস সংগীতেও আমাদের সেই বাহিরের সংস্রব প্রয়োজন রহিয়াছে।
তাহাকে প্রাচীন দস্তুরে লোহার সিন্দুক হইতে মুক্ত করিয়া বিশ্বের হাটে ভাঙাইয়া দিতে হইবে।
ইউরোপীয় সংগীতের সঙ্গে ভালো করিয়া পরিচয় হইলে তবেই আমাদের সংগীতকে আমরা সত্য করিয়া বড় করিয়া ব্যবহার করিতে শিখিব।
২ নম্বর বঙ্কিম আনলেন সাত সমুদ্র পাড়ের রাজপুত্রকে আমাদের সাহিত্য রাজাসোনার পালঙ্কের শিয়রে।
তিনি যেম্মি ঠেকালেন সোনার কাঠি অমনি বিজয় বসন্ত লায়লা মজনু হাতির দাঁতে বাঁধানো পালঙ্কের ওপর রাজকন্যা নড়ে উঠলেন।
চলতি কালের সঙ্গে তার মালা বদল হয়ে গেল তারপর থেকে আরেক ক্ষেত্রে ঠেকিয়ে রাখে কে।
তারপরে তিন নম্বর লিখছি যারা মনুষ্যত্বের চেয়ে কৌলিন্যকে বড় মনে করে তারা বলবে ওই রাজপুত্রটা বিদেশী।
তা বিদেশী হইলে কী হয়।
মানুষ তাকেই চায় যা বস্তুতঃ এ বাস্তব জঘন্য বসে না যার তার প্রাণের সঙ্গে চলে যাকে মুক্তির স্বাদ দেয়।
চার নম্বর হইলো সমুদ্র পাড়ের রাজপুত্র আইসা মানুষের মনকে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে দেয় জাগিয়ে দেয় ছুঁইয়ে জাগিয়ে দেয়।
এটা তার ইতিহাসে চিরদিন ঘটে আসছে।
আপনার পূর্ণ শক্তি পাওয়ার জন্য বৈষম্যের আঘাতের অপেক্ষা তাকে করতেই হয়।
কোনো সভ্যতাই একা আপনাকে আপনি সৃষ্টি করে নাই।
তারপরে ৫ নম্বর দিছি সম্প্রতি আমাদের দেশে চিত্রকলায় যে নবজীবন লাভের লক্ষণ দেখতেছি তার মূলেও সেই সাগর পাড়ের রাজপুত্রের সোনার কাঠি আছে।
৬ নম্বর লিখছি কাটিছে তো প্রথম অবস্থায় ঘুমের ঘোরটা যখন সম্পূর্ণ কাটে না তখন আমরা নিজের শক্তি পুরোপুরি অনুভব করিনা তখন অনুকরণটা বড় হইয়া ওঠে কিন্তু ঘোরটা কাটিলেই আমরা নিজের জোরে চলিতে পারি।
পথ নানা অভিপ্রায়টি আমার শক্তিটি আমার যদি পথের বৈচিত্র্য রুদ্ধ করি যদি একটি বাঁধা পথ থাকে তাহলে অভিপ্রায়ের স্বাধীনতা থাকে না তাহলে কলের চাকার মধ্যে চলিতে হয়।
সেই কলের চাকার পথটাকে চাকার স্বকীয় পথ বলে গৌরব করার মতো অদ্ভুত প্রহসন আর জগতে নেই।
৭ নম্বর আমাদের সাহিত্যে চিত্রে সমুদ্র পাড়ের রাজপুত্র এসে পৌঁছেছে কিন্তু সংগীতে পৌঁছয়নি।
সেই জন্যই আজ সংগীত জাগতে দেরি করছে অথচ আমাদের জীবন জেগে উঠেছে।
৮ নম্বর দ্বিজেন্দ্রলালের গানের সুরের মধ্যে ইংরেজি সুরের স্পর্শ লেগেছে বলে কেউ কেউ তাকে হিন্দু সংগীত থেকে বহিষ্কৃত করতে চান।
যদি দ্বিজেন্দ্রলাল হিন্দু সংগীতে বিদেশী সোনার কাঠি ছুঁইয়ে থাকেন তবে সরস্বতী নিশ্চয়ই তাকে আশীর্বাদ করবেন।
এই ৮টা পয়েন্ট আমি তারে লেখে দিলাম বুঝলা।
তারপরে রবীন্দ্র ও পাশ্চাত্য সংগীত influence ও পাশ্চাত্য সংগীত সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের কী ধারণা আমাদের জানা হয়ে গেল।
এবং এই কথাটাই সকলেই জানেন যে জ্যোতি দাদার পাশ্চাত্য কায়দায় পিয়ানো বাজনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অনেক গানের জন্ম হইছিল তাছাড়া অনেকেই জানেন যে বিদেশী সুরে অনেক বিদেশী সুরে রবীন্দ্রনাথ নিজেও তা অনেক গান বানাইছেন।
আর রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড করার প্রথম দিকে সুর শুনলে প্রথম দিকের গানগুলি রেকর্ডগুলি শুনলে মনে হবে হারমোনি আর অর্গান বা বাঁশি দিয়া গান করা হইছে।
কিন্তু এখন তখন কোনো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে কোনো রকম একটা আইডিয়া হইছিল হয় নাই।
বুঝলা কিনা।
আর গান রেকর্ড করার বেলা যে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারে কোনো রকম কায়দা ছিল না কিন্তু কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন যুগের সোনার কাঠির ছোঁয়া লাগিয়া আটের সবগুলি ক্ষেত্রে নতুন নতুন কায়দা বাইর হইছে।
বুঝলা নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলছে।
৫০ বছর আগেকার যে রূপে এবং যে ভঙ্গিতে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হইত বা রেকর্ড করা হইত এখনকার দিনের রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে চেহারা সঙ্গে তার কোনো মিলই নাই।
এবং ভবিষ্যতে যে আরো হবে না কে জোর দিয়া কইতে পারে।
এমনকি রবীন্দ্রনাথ নাকি বলছিলেন যে তাঁর গানই নাকি টিকিয়া থাকবে।
কি করে টিকবে?
সেই ঠাকুরমা আমলের কাঁটা দিয়া জড়াইয়া ফোল্টাইয়া করিয়া সেই নতুন নতুন নিয়মের বিধান খাওয়া রবীন্দ্রসংগীতকে বাঁচাইয়া রাখা যাইব?
এইসব কথা আমি সব লিখছি।
তিনি বলেছিলেন সুরকারের সুর বজায় রেখো expression-এর কম বেশি স্বাধীনতা চাইবার ইখতিয়ার গায়কের আছে।
বুঝলা।
এখন বলা বাহুল্য বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ গায়ককে এবং শ্রোতাকেও expression-এর ব্যাপারে যে বিপুল সাহায্য করে তা শুধু অনুভূতির ব্যাপার বিশ্লেষণ করে বোঝা যায় না রসায়নের মতো।
রসায়ন এনাম বিশ্লেষণ করে কিন্তু এই গানের রস অন্যরকম।
পাশ্চাত্য সংগীত বা ইউরোপীয় সংগীত সম্পূর্ণ বিদেশী তাকে আয়ত্ত করতে গেলে অনেক বছরের সাধনার প্রয়োজন হয় বুঝতে গেলেও তাই প্রয়োজন।
মিউজিক বোর্ডের তালিকাভুক্ত বাদ্যযন্ত্রগুলি ব্যতিরেকে অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র রেকর্ড করার সময় ব্যবহার করলেই Western ইনফ্লুয়েন্সের উৎপাদ আইসা জুটব এমন একটা অদ্ভুত ধারণার পিছনে কোনো বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আছে কি না আমি জানি না তারা পণ্ডিত Western মিউজিকের তারাও বোধহয় বুঝবেন না।
তা যাই হোক আমি কইয়া দিছি যে আমার এই রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ধারাকে কোনো মূল্য না দিয়া তাঁর নির্দেশ অমান্য করিয়া নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ওই মাঝারি কর্তাদের নির্দেশ ও বিধিনিষেধ মাইনা রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করার মতো ধৃষ্টতা আমার নাই প্রবৃত্তিও নাই।
এই ব্যাপারে যতদিন এই যুক্তিহীন কতগুলি নিয়ম বলবৎ থাকবে ততদিন আমি নিজেরে দূরে সরাইয়া রাখব তবে আমি হালে দেখছি যে কয়েকজন তরুণ রবীন্দ্রসংগীত গায়ক গায়িকা অতি সুন্দর গাইতেছেন মনে হয় তাদের মধ্যে প্রচুর সম্ভাবনা রইছে।
লক্ষ্য করছি তারাও এই ব্যাপারে বেশ ভাবনা চিন্তা করেন আমার মনে হয় এই নিয়মের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর মতো সাহস ও ক্ষমতা কারো নাই তাদের পোলাপান তো সব।
আমার এক কথা মনে হয় যে আপনি কিছু করতে পারবেন না তবে আপনার কাছে আমার এই নিবেদন যে আপনি দয়া করিয়া যথার্থ সংগীতজ্ঞ সংগীত রসিকদের ডাইক্কা একটা আলাপ আলোচনা করিয়া এমন একটা ব্যবস্থা করেন যাতে রবীন্দ্রসংগীত শুকনা কাঠ হইয়া না যায়।
এই একটা আমি চিঠি লিখলাম আর আরেকটা রবীন্দ্রনাথের একটা কোটেশন দিছি যে যারা বড় যারা সেই দায় স্বীকার করিয়া মানুষকে মুক্তি দিতে চায় তারা জানে মানুষের পক্ষে সবচেয়ে ভয়ংকর মাঝারির শাসন।
এই শাসনে যা কিছু সবুজ তা হলদে হইয়া যায় যা কিছু সজীব তা কাঠ হইয়া ওঠে।
এই হইলো রেকর্ড।
তো উনি জিনিসটা অবশ্য ঠিক বুঝতে পারেন নাই আমার কমপ্লেইনটা কী।
তিনি ভাবছেন যে আমার গানগুলি অনুমোদন করানোর জন্যই আমি তারে লিখছি।
সেই জন্য তিনি বললেন যে আমার তো এইসব তো জানো তুমি আমি খালি সই করি।
তা এহন থেকে ভাবছি যে টেপ disapproved হইলে পরে আমি নিজে শুনব নিজে শোনার প্রয়োজন হইছে তবে আমার মতামতের মূল্য পাব কি এবার এ বিষয়ে সন্দেহ আছে।
যাই হোক এ বিষয়ে আমার কিছু করার আগে তোমার সঙ্গে দেখা হওয়া এবং একটু আলোচনা দরকার।
দেখা করতে পারবে কি?
তা আমি ও অবশ্যই লিখছি দেখা আমি করতে পারি কিন্তু আসল যে ব্যাপারটা সেইটা আপনে একটু যদি বোঝেন।
তা আমি বলছি যে আপনে নিশ্চয়ই কাগজপত্র আইজ দিনে পেয়ে গেছেন।
তা আপনে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করছেন যে নানা জানা অজানা কারণে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন হইয়া গেছে।
এখন উদার দৃষ্টিভঙ্গি যেগুলি ছিল রেকর্ড অনুমোদন করার ব্যাপারে আগের দিনে এখন আর নাই।
তা এহন আপনি এইটা ফিরা পাবেন কেন আমি জানি না।
তা যারা নাকি বোর্ডের এখন বর্তমান কালের পরীক্ষক তাদের মধ্যে অধিকাংশ পরীক্ষকই রবীন্দ্রনাথের তিরোধানের পরে শান্তিনিকেতনে সংগীত শিক্ষা লাভ করছেন এখন তারা যেভাবে শিখছে সেইভাবে তারা বিচার করেন তা ছাড়া উপায় কি আর যদি কোনো গান তারা আগে না শিখিয়া থাকেন তাইলে স্বরলিপি লইয়া তারা বসেন।
স্বরলিপির বই খুইলা বসেন বিচার করেন।
তা আমার সন্দেহ হয় যে এই পরীক্ষকরা রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের উদার মনোভাবের পরিচয় হয়তো পান নাই অথবা পেয়ে থাকলেও রবীন্দ্রনাথের এই মনোভাবের কোনো মূল্যই তারা দিতে চান না বা পারেন না।
গায়কের এক্সপ্রেশন এবং interpretation-এর স্বাধীনতা সম্বন্ধে দিলীপ বাবুর সঙ্গে আমি একটা তাঁর যে আলাপ আলোচনা হইছে কিছুটা আমি ওরে কইছিলাম।
তা এখন আবার বাকিটুকু আমি পইড়া শুনাই দিতাছি।
আর শোনাইতাছি মানে লিখে দিলাম।
গানের রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন গানের গতি অনেকখানি তরল কাজেই তাতে গায়ককে খানিকটা স্বাধীনতা তো দিতেই হবে না দিয়া গতি কি ঠেকাব কি করে।
তাই আদর্শের দিক দিয়া আমি বলিনি যে আমি যা ভাব এবং সুর দিয়েছি তোমাকে গাওয়ার সময় সেইভাবেই ভাবিত হতে হবে।
কাজে হতেই পারে না কারণ গলা তো তোমার এবং তোমার গলায় তো তুমি গোচর হবেই তাই expression-এর ভেদ থাকবেই যা কি তুমি বলছো interpretation-এর স্বাধীনতা।
বলছিলে বিলেত তো গায়ক বাদকের এই স্বাধীনতা মঞ্জুর মঞ্জুর হতে বাধ্য।
শাহানার মুখে যখন আমি গান শুনতাম আমার গান শুনতাম তখন কি আমি শুধু শাহানাকেই শুনতাম না তো শাহানাকেও শুনতাম।
বলতে হতো আমার গান শাহানা গাইছে।
তোমার ঢঙের সম্বন্ধে আমার বক্তব্য এই যে তোমার একটা নিজস্ব ঢঙ গড়ে উঠেছে এটা তো খুবই বাঞ্ছনীয় তাই তোমার স্বকীয় ঢঙে তুমি এ ক্ষণিকের অতিথি গাইলে যেভাবে।
আমার সুরের গঠন ভঙ্গি রেখে expression-এর যে স্বাধীনতা তুমি নিলে তাতে আমি সত্যি খুশি হয়েছি।
এ গান তুমি গ্রামোফোনে দিতে চাইছ দিও আমার কোনো আপত্তি নেই কারণ এতে আমার সুররূপের কাঠামোটি জখম হয়নি তোমার এক কথাও আমি স্বীকার করি যে সুরকারের সুর বজায় রেখে expression-এর কমবেশি স্বাধীনতা চাইবার ইখতিয়ার গায়কের আছে বুঝলা।
কেবল প্রতিভা অনুসারে কম ও বেশির মধ্যে তফাত আছে এক কথাটি ভুলো না।
প্রতিভাবানকে যে স্বাধীনতা দেব অকুন্ঠ গড়পড়তা গায়ক ততখানি স্বাধীনতা চাইলে না করতেই হবে।
এই তিনি দিলীপ রায় মশায়রে কইছিলেন বুঝলা।
তো রবীন্দ্রনাথ যতদিন বাইচা ছিলেন তখন তো কোনো প্রবলেমই ছিল না কিন্তু এখন এখন কে বেশি প্রতিভাবান কে কম প্রতিভাবান আর কে গড়পড়তা গায়ক তার বিচার এখন কে করবে আর কিভাবে করাবে?
বিচার করতে গেলেই তো আরম্ভ হইয়া গেল বিবাদ বিদ্ধেষ এবং কাদা ছোড়াছুড়ি পরস্পরের প্রতি।
তাই বলছিলাম উদার দৃষ্টিভঙ্গি সেই উদার দৃষ্টিভঙ্গি আর নাই।
তা এহন গোঁড়ামি অনাদি দা বইলা একজন ছিলেন তিনি মারা গেছেন তাঁর গোঁড়ামি ছিল কিন্তু তাঁর অনেক উদারতাও ছিল জাস্ট একটা এক্সাম্পল তারে আমি দিয়ে দিচ্ছি।
আরেকটা মজার ঘটনার কথা উল্লেখ আমি করলাম সেটা হলো ১৯৬৪ সনে আমার একটা রেকর্ড করা গান আসিয়া ছিল তবুও আস নাই বোর্ডের অনুমোদন পাইল না।
ভুল গাওয়া হইছে বলা হইছিল।
পরে শান্তিপদ ঘোষ মশায়রে যখন গানটা শুনাইল তিনি লিখলেন এইভাবে সুর অবশ্যই হইতে পারে এতে কোন দোষ নাই।
আমার মনে হয় ছাপায় কোনো গোলমাল ঘটেছে।
আচ্ছা এই শান্তিবাবুর যা মনে হইছে তাই তিনি ব্যক্ত করছেন।
I mean মনে হওয়া ব্যাপারটা খুব গোলমাইল্লা যিনি আমার এই গান অনুমোদন করেন নাই তাঁর এক রকম মনে হইছিল আবার শান্তিপদ বাবুর অন্যরকম মনে হইলো কার মনে কী মনে হয় তা কওন খুব কঠিন ব্যাপার।
সুতরাং রেকর্ডের অনুমোদনের বিচারের ক্ষেত্রে কোনো uniformity আশা করা বৃথা।
অবশ্যই একটা কথা স্বীকার করতেই যে কিছু তো একটা নিয়ম মানার দরকার এখন রবীন্দ্রনাথ নিজে কোনো নিয়ম করে দিয়ে যান নাই তো এহন এই যে ছাপানো স্বরলিপিগুলি এইটা দিয়া একটু ইম্পর্টেন্ট দেওয়া হয়।
যদিও তাতে অনেক সময় ভুল থাকে তবুও তা দেইখা সুরের স্ট্রাকচারের একটা ধারণা করা যায়।
স্বরলিপিতে যা সুর বা স্বর লেখা থাকে সেগুলি strictly মাইনা চললেও বিভিন্ন ঢঙের গান হইতে পারে।
গানটা গি বিভিন্ন ঢঙের ঢঙের হইতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ও তাই বলেছেন।
তবে বিশেষ কতগুলি ক্ষেত্রে শ্রুতির খাতিরে স্বরলিপিতে যে মাত্রাবাদ ব্যবহার থাকে তার সামান্য একটু অদলবদল করতেই হয় তা নইলে গান শুকনা কাঠ হইয়া যাইতে বাধ্য।
আমি এই ধরনের অদলবদল দিনেন্দ্রনাথকেও করতে দেখছি ইন্দিরা দেবীকেও করতে দেখছি স্বরলিপি তৈরীকরণ সময় শুধুমাত্র সুরের একটা broad outline ধরানো যায় সেটিই সম্ভব কিন্তু শ্রুতি আর গায়নভঙ্গি স্বরলিপি করিয়া বুঝানো অসম্ভব।
রবীন্দ্রনাথ নিজেও গায়কের নিজস্ব ঢঙের ব্যাপারে গায়ককে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন না।
তা আমি শুনছি যারা মিউজিক বোর্ডের পরীক্ষক তাদের অনেকেই আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট।
তারা যদি ভাবেন যে বিশেষ কোনো গানের ইন্টারপ্রিটেশন এবং expression-এর ব্যাপারে তাদের যা ধারণা সেইডাই ঠিক আর সেইভাবেই আমাকে ভাবিত হইতে হবে তাইলে আমার বলার কিছুই নাই এই ব্যাপারে আপনার কিছু করা উচিত হবে কি না তা আমি জানি না এইটা আমি সেই সেক্রেটারিকে লিখলাম।
sentiment এবং expression-এর ব্যাপারে তারা যদি আমায় কোনো স্বাধীনতা দিতে না চায় তাহলে তাদের সঙ্গে ঝগড়া করার চাইতে চুপ করে থাকাটাই আমার কাছে খুব শ্রেয় মনে হয়।
তবে আমার গানে রেকর্ডগুলি অনুমোদনের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্য নিয়ে আপনারে আমি চিঠি লেখি নাই আমি শুধু নতুন কতগুলি অর্থহীন যুক্তিহীন নিয়মের বিরুদ্ধে আমার প্রতিবাদ জানাইতে চাইছিলাম।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস মিউজিক accompaniment, interlude music ভেরিয়াস টাইপস অফ মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস টেম্পো স্টাইল এন্ড মোড তালের ঝোঁক ইত্যাদি ব্যাপারে নতুন যতসব বিধিনিষেধের বেড়াজাল এই রবীন্দ্রসংগীত এবং তরুণ গায়ক গায়িকা কারোর পক্ষেই মঙ্গলজনক হইতেই পারেন না এই নিয়মগুলি যাতে গায়ক গায়িকাদের কাঁধে না চাপানো হয় তার একটা ব্যবস্থা করবার জন্যই আমি আপনার কাছে নিবেদন জানাইলাম আমি আশা করছি আপনার সহানুভূতি ও সহৃদয়তা এই চিঠি আমি পাঠাইছি এই ২৮শে ফেব্রুয়ারি।
এখনো কোনো জবাব পাই নাই।
[সংগীত] Citations